পুজো স্পেশাল

গৌড়বঙ্গের সন্ধানে

শুভ অনেকবারই বলেছিল মালদা থেকে ঘুরে যেতে শুভ আমার ভগ্নীপতি সরকারী চাকরির সুবাদে মালদায় থাকে মালদা মানে শুধুই আম-লিচু নয় মালদা মানেই গৌড় মালদা মানেই ইতিহাস যাব যাব করেও যাওয়া হয়নি প্রতি বছর পুজোর আগে আমি একটা করে ট্যুর করি কিন্তু এবার বিভিন্ন কারণে বেরোনো হল না তাই ঠিক করলাম দু’দিনের জন্য মালদা ঘুরে আসব জেঠতুতো ভাই সুন্দরকেও ডেকে নিলাম তারপর রাতের যোগবাণী এক্সপ্রেসে চেপে বসলাম আমরা কলকাতা স্টেশন থেকে অনেকদিন পর শহর ছেড়ে দূরে কোথাও বেরুলাম বলে দুজনেই বেশ রোমাঞ্চিত হইহই করতে করতে রওনা দিলাম ট্রেন চলতে শুরু করতেই চটপট রাতের খাওয়া সেরে নিয়ে মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়ে ঘুমের চেষ্টা করতে লাগলাম কারণ মালদা আসবে খুব ভোরে

 

মালদা আসার বেশ কিছুটা আগেই আমাদের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল ট্রেন প্লাটফর্ম ছুঁতেই আমরা নেমে এলাম উফ কী খুশি লাগছে অনেকদিন পর একটু স্বাধীন হবার জন্য রোজগার নিয়মের যাঁতাকলে পিষে থাকার পর আজকের এই খোলা আকাশের নিচে দাঁড়ানোটা যেন অদ্ভুত একটা আনন্দ দিচ্ছে

 

বোনের সরকারী আবাসনে পৌঁছে দ্রুত স্নান জলখাবার সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম বাসস্ট্যান্ডের কাছেই ট্যাক্সি স্ট্যান্ড ট্যাক্সি বলতে আমরা কলকাতায় যেমন বুঝি এখানে তেমন ব্যাপারটা নয় সাধারণ অ্যাম্বাসাডর গোছের গাড়িগুলোই ভাড়া খাটছে আমরা দু'দিন ঘোরার প্ল্যান করেছিলাম প্রথমদিন একটা দিক ঘুরব আর তার পরদিন বাকিগুলো সেই মতো প্রথমদিন ঘোরার জন্য এক হাজার টাকায় রফা হল

 

শুভ এসব জায়গায় আগে অনেকবার এসেছে তাই আজ ও আমাদের পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় প্রথমে আমরা পৌছলাম শ্রী শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর চরণ মন্দিরে শুনলাম শ্রী চৈতন্য নাকি এককালে এখানে এসে এই কদম গাছের তলায় বিশ্রাম নিয়েছিলেন আর এই কদম আর তার পাশের তমাল গাছটি নাকি সেই ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে আজও বহাল তবিয়তে বিদ্যমান

 

 

এখানে বেশ নিরিবিলিতে একটি আশ্রম রয়েছে আর আছে শ্রী চৈতন্যের পায়ের ছাপ সম্বলিত একটি পাথর

 

 

 

পরবর্তী দর্শনীয় স্থান বারদোয়ারী বা বড়সোনা মসজিদ এটি গৌড়ের একটি আকর্ষনীয় মুসলিম কীর্তি ১৫২৬ সালে সুলতান নসরত শাহের তৈরী এই মসজিদের চারধারে খিলান খচিত বারান্দা বারোটি প্রবেশদ্বার থাকার জন্যই এই নাম তবে এখন এগারোটি প্রবেশদ্বারই নজরে পড়ে মূল গম্বুজের উপরে সোনালী চিকন কাজের জন্য একে বড়সোনা মসজিদ নামেও ডাকা হয়

 

 

পরের গন্তব্য সেলামি দরওয়াজা এটি নির্মাণ করিয়েছিলেন বারবাক শাহ এটি আসলে গৌড় দুর্গের উত্তর দিকের প্রধান প্রবেশ পথ এইখান থেকে গোলাবর্ষণ করে সম্মান প্রদর্শন করা হত বলে একে সেলামি দরওয়াজা বলা হত এখানে ছবি তোলার লোভ সামলাতে পারলাম না বেশ কিছুক্ষণ ফটোসেশন চলল তারপর চললাম ফিরোজ মিনারের উদ্দেশ্যে

 

ফিরোজ মিনারের নির্মাতা সৈফুদ্দিন ফিরোজ নামক এক হাবসী ইনি বরবক শাহকে হত্যা করে গৌড়ের সুলতান হয়েছিলেন মিনারটি প্রায় ২৫.৬০ ফুট উঁচু আর এর উপরে ওঠার জন্য গোল তিয়াত্তরটি ধাপ যুক্ত সিঁড়ি আছে

 

প্রতিটি জায়গা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া যত্ন করে সবকিছুর রক্ষনাবেক্ষন করছেন সুদৃশ্য এবং ঝকঝকে তকতকে যেকোন জায়গায় ইচ্ছে হলে মাটিতে নরম সবুজ ঘাসের গালিচার ওপর বসে পড়া যায়

  

এবার আমরা পৌঁছলাম বাইশগজি দেওয়ালের কাছে এই বাইশ গজ লম্বা দেওয়ালটি গৌড়কে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে তৈরী করা হয়েছিল, কারণ এর খুব কাছেই ছিল জাহাজঘাটা আর বল্লাল সেনের রাজবাড়িও এখানেই—বল্লাল বাটি বল্লাল বাটিতে শুভ আমাদের দেখালো যে রাজবাড়ির যে ভগ্নাবশেষ রয়েছে তাতে কিছুদূর অন্তর গোল গোল পিলারের মত অবশেষ আর তার মাঝখানে ছিদ্র এগুলো নাকি নদী থেকে জল টেনে এনে ভরে দেবার ব্যবস্থা ছিল এককালে আর তাতে রাজবাড়ি গরমের সময় ঠান্ডা থাকত আধুনিক শীততাপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র আরকী ভাবা যায়!

 

বাংলায় কী অপূর্ব সম্পদ আছে, কী অসাধারণ মেধা, বুদ্ধি আছে এগুলো অনুভব করতে হলে একবার গৌড় আসাটা খুবই দরকার

 

খানিক জলপান বিরতির পর আমরা এগিয়ে গেলাম চিকা বা চামকান মসজিদের উদ্দেশ্যে এই এক গম্বুজ বিশিষ্ট স্থানটিকে মসজিদ বললেও কিন্তু সন্দেহ করা হয় এটা একটি সমাধিস্থল কথিত আছে সুলতান হুসেন শাহ এটিকে কারাগাররূপে ব্যবহার করতেন উল্লেখ্য যে এখানে ব্যবহৃত পাথর ও মীনা করা ইন্ট আনা হয়েছিল হিন্দু মন্দির থেকে এক সময় এখানে প্রচুর চামচিকা বাস করত তাই একে চিকা মসজিদ বলা হত চিকা মসজিদের পাশে একটি খোলা জায়গায় প্রচুর পাথরের খিলান এখনও পড়ে আছে সেই খিলানকে জড়িয়ে ধরে আমরা বেশ কিছু ছবি তুললাম

 

সুলতান হুসেন শাহের তৈরী গুমটি দরওয়াজা আমাদের পরবর্তী দর্শনীয় স্থান এনামেল টালি দ্বারা নির্মিত গম্বুজওয়ালা এই তোরণটি আসলে গৌড় দুর্গের পূর্বদিকের প্রবেশ পথ ছিল

এরপর গেলাম কদম রসুল মসজিদ ১৫৩১ সালে চতুষ্কোণ গম্বুজওয়ালা এই মসজিদ তৈরি করেছিলেন সুলতান নসরত শাহ এর মধ্যে একটি পাথরে হজরত মহম্মদের পদচিহ্ন রক্ষিত ছিল এখন এটি মহদিপুর খাদেমের কাছে রাখা আছে

 

এরপর আমরা সোজা গেলাম বাংলাদেশ বর্ডার এখান দিয়ে পদব্রজে বাংলাদেশ প্রবেশ করা যায় তবে অবশ্যই অনুমতি, পাসপোর্ট, ভিসা ইত্যাদির প্রয়োজন আমরা এখানে পাঁচশতাধিক বছরের প্রাচীন একটি পাঁচিলের ওপর উঠে বাংলাদেশের মাটি দর্শন করে চক্ষু সার্থক করলাম ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে পূর্ববঙ্গকে দেখার রোমাঞ্চই আলাদা আমাদের আর বাংলাদেশের মাঝে নো ম্যানস্ ল্যান্ড ওদিকে উড়ছে ও বাংলার পতাকা, এদিকে এ বাংলার বাধা কিছু রক্তচক্ষুর ইচ্ছে ছিল কয়েকটা ছবি তোলার কিন্তু সাহস করলাম না, কারণ আগেই বি.এস.এফ. কর্তারা বলে দিয়েছিলেন, “যত ইচ্ছে দু’চোখ ভরে দেখুন, কিন্তু ছবি তুলবেন না।” তাই সে ইচ্ছে পূর্ণ হল না

 

এখান থেকে ফেরার পথে পড়ল লোটন মসজিদ আমরা যখন গিয়েছিলাম তখন প্রধান প্রবেশপথ বন্ধ ছিল কিন্তু কেয়ারটেকার ভদ্রলোক আমাদের প্রায় রাজসমাদর করে দেখে পিছনের দরজা দিয়ে ভিতরে নিয়ে গেলেন যত্ন করে বলতে লাগলেন এই স্থানের মাহাত্ম্য কিংবদন্তি আছে এই মসজিদটি এক রাজ-গণিকা তৈরী করেছিলেন ১৪৭৫ সালে তবে সম্ভবত এটি তৈরী করেছেন সুলতান ইউসুফ শাহ এর দেওয়ালটি একসময় রঙিন ইঁট দিয়ে তৈরী ছিল এখন তার সামান্যই চিহ্ন বর্তমান এর দুটি গম্বুজ আর ঢালু ছাদ এর সৌন্দর্য্য চেয়ে থাকার মত

 

আজকের মত এখানেই বিশ্রাম আমরা ভগিনী-আলয়ে ফিরে এলাম গরম গরম খাবার আমাদের প্রতীক্ষায় ছিল

 

 

পরদিন শুরু করলাম একলাখী সমাধিসৌধ দিয়ে আনুমানিক ১৪১২-১৫ খ্রীস্টাব্দে তৈরী এই গম্বুজওয়ালা সমাধিসৌধটি তৈরী করেছিলেন রাজা গনেশ বা কংস তাঁর পুত্র যদু  ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে জালালুদ্দিন নাম বাংলার সুলতান হয়েছিলেন তাঁর অকাল মৃত্যুর পর পিতা গনেশ এই সৌধ তৈরী করেন স্মৃতির উদ্দেশ্যে সেই সময় এটি তৈরী করতে এক লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল বলে এর নাম একলাখী এই সমাধিকক্ষে জালালুদ্দিনের স্ত্রী ও পুত্রের মৃতদেহ সমাধিস্থ আছে

 

একলাখী সৌধের পাশেই আছে কুতুব শাহী মসজিদ বা সোনা মসজিদ পীর নুরকুতুব-উল-আলমের স্মৃতি রক্ষার জন্য এই মসজিদ তাঁর বংশধর ও শিষ্য মখদুম শেখ নির্মাণ করেছিলেন একসময় মিনার শীর্ষ ও বাইরের দেওয়াল ছিল সুবর্ণমন্ডিত বলাই বাহুল্য এর নামকরণ এই কারণেই

 

 

আদিনা বা জমি মসজিদ হল গৌড় মালদার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ আমাদের পরের গন্তব্য ছিল এই আদিনা মসজিদ সিকন্দর শাহ এই সুবিশাল মসজিদটি তৈরী করেছিলেন বিশাল প্রার্থনাস্থলটিতে বাদশাহ-কি-তখকত নামক আসন আছে সুলতান ও তাঁর পরিবারের মহিলাদের জন্য আছে উচ্চ আসন পশ্চিমদিকের একটি কক্ষে সুলতান সিকন্দর শাহের সমাধি আছে

 

আমাদের শেষ গন্তব্য ছিল জহরা কালী মন্দির এই মন্দির সম্পর্কে নানান কিংবদন্তি প্রচলিত আছে জহরা মানে যে বিষাক্ত অনুমান করা যায় লোকমুখে প্রচলিত যে কালাপাহাড় নাকি এই মন্দিরটি ধংস করার জন্য এসেছিল সেই সময় দেবী ভয়ঙ্কর এক রূপ ধারণ করে তার সামনে হাজির হয় আতঙ্কিত কালাপাহাড় “এহ তো জহরা হ্যায় রে” অর্থাৎ বলে চিত্কার করতে করতে পালায় সেই থেকে কালীর এই রূপের নাম হয়ে যায় জহরা

 

মন্দিরে দেবী দর্শন করে আমরা ফিরে এলাম নিজ নিকেতনে

 

শুভ আমাকে আরো কয়েকদিন থাকতে বলছিল তাহলে ভূতনির চরে নিয়ে গিয়ে আদিবাসী গ্রামে সুস্বাদু বাঁশপোড়া অর্থাৎ ব্যাম্বু-মাটন খাওয়াবে বলল কিন্তু অফিসের মারাত্মক চাপের কাছে নতি স্বীকার করতেই হবে যে বোনের হাতের মাটন খেয়ে রাতের ট্রেনে ফিরতে হবে কলকাতা প্রচুর সুখস্মৃতি আর ফিরে যাবার বিষন্নতাকে গায়ে মেখেই ফিরতে হবে শহুরে কথকতায়

 

– বাবিন

মতামত