বাবিন

জটিল মাহাতোর গপ্পো

“না-আ-আ-আ...”

শুভপিসে’র পরিত্রাহি চিত্কার শুনে আমরা সবাই আঁতকে উঠলাম! কী হয়েছে, কী হয়েছে করে সবাই প্রায় দৌড়ে এলাম পিসে’র দিকে। দেখি পিসেমশাইয়ের সামনে মা সাজিয়ে দিয়েছেন এক থালা ভর্তি গরম গরম আলুর বড়া, পিঁয়াজি আর গরম তেলে মাখা মুড়ি। আর সেই মুড়ির স্তুপের উপর গোটাকতক কাঁচা লঙ্কা। এর মধ্যে আতঙ্কের কী আছে আমরা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না।

শুভপিসে’র ভালো নাম শুভঙ্কর। কিন্তু আমরা আড়ালে মজা করে ডাকি ভয়ঙ্কর। তবে তা বলে যেন ভেবো না যে উনি খুব রাগী। একদম ঠিক তার উল্টো। সবসময় হাসিখুশি মুডে থাকেন। আর আমাদের বাড়ি এলেই ছোটদের প্রচুর উপহার দেন। বই, খেলনা, চকলেট ইত্যাদি। এছাড়া যেখানে যখনই ঘুরতে যান আমাদের জন্যে কিছু না কিছু কিনে আনেন ঠিক। তাই আমরা বাড়ির ছোটরা ওঁকে খুবই পছন্দ করি। তারওপর পিসেকে চাকরির জন্য নানান জায়গায় ঘোরাঘুরি করতে হয় বলে ওঁর গল্পের ঝুলি ঠাসা। উনি যখনই আসেন আমরা ওঁকে ঘিরে ধরি গল্প শোনার জন্য।

তাহলে এহেন পিসে ভয়ঙ্কর হয় কী করে? বলছি শোন, ওঁর চেহারাটাই এই ভয়ঙ্কর নামের পিছনে লুকোনো রয়েছে। মানুষটার চেহারাটা যেমন বিশাল, তেমনই ভালবাসেন খেতে। শুনেছি একবার একটা রিক্সায় বসার ফলে সেটা ভেঙে দু’টুকরো হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে পিসে আমাদের বাড়ি এলে বাড়ি থেকে গাড়ি পাঠানো হয়। শুনেছি কম বয়সে পিসে কিন্তু এত মোটা ছিলেন না, অডিটরের চাকরি সূত্রে যেখানেই যান সেখানেই প্রচুর খাতির-যত্ন পান। আর সেই খাতিরের ঠেলায় পিসের এহেন চেহারা।

পিসের পছন্দ অনুযায়ী মা ঘরেই তেলেভাজা বানিয়ে পাঠিয়েছেন, কিন্তু পিসে এমন করে চিত্কার করে উঠল কেন সেটা ঠিক পরিষ্কার হল না। ইতিমধ্যে মা-ও এ ঘরে এসে হাজির হয়ে গেছেন। মা জিজ্ঞাসা করলেন, “কী হয়েছে, শুভদা। খাবারে কিছু পোকা-টোকা পড়েছে নাকি?”

পিসে মুড়ির স্তুপের ওপরে থাকা লঙ্কাটার দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে আতঙ্কিত সুরে বলে উঠলেন, “লঙ্কা!”

পিসের বলার ভঙ্গিতে আমরা ছোটরা মুখ লুকিয়ে মুচকি মুচকি হাসতে লাগলাম। মা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি লঙ্কা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন? আগে তো বেশ মুড়ির সঙ্গে চেয়েচিন্তে লঙ্কা খেতেন।”

পিসে খুবই ভীত সুরে বললেন, “বৌদি সে এক মারাত্মক ঘটনা, সব বলব, আগে মুড়িটা খাই। আপনি লঙ্কাটা সরিয়ে নিন, আমার কেমন যেন করছে শরীরের ভেতরে!”

মা অবাক চোখে পিসের দিকে তাকিয়ে লঙ্কাগুলো তুলে নিয়ে চলে গেলেন।



মুড়ি-তেলেভাজা শেষ হবার পর চায়ে চুমুক দিয়ে পিসে শুরু করলেন ঘটনাটা বলতে।

“তোমরা তো জানই অডিটের কাজের জন্য আমাকে ঘোরাঘুরি করতে হয়। তা সেবার ঘুরতে ঘুরতে গিয়েছিলাম মালদা’র এক অজপাড়াগাঁয়ের কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কে অডিট করতে। যেতেই রাজার মতো খাতির যত্ন শুরু করে দিল সব্বাই। কেক, মিষ্টি থেকে শুরু করে মুড়ি, মালপোয়া পর্যন্ত। এটা অবশ্য নতুন নয়। অডিটের কাজে যেখানেই যাই সেখানেই এভাবে জামাই আদর পেয়ে থাকি। আর তার আতিশয্যে আমার ভুড়ি যেভাবে দিন কে দিনে বেড়ে চলেছে তাতে এসব একটু এড়িয়েই চলছিলাম। তাই শুরুতেই মানা করে দিলাম।”

“কর্তাব্যক্তিরা চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী খাবেন বলুন তো, ব্যবস্থা করছি।’

“ভেবেচিন্তে দেখলাম ডিম খেলে খুব একটা ক্ষতি হবে না, তাই ইতস্তত করে বললাম, ‘সিদ্ধ ডিম হবে কি?’

“মুখ থেকে কথা বার করতেই একটা দুটো নয় ছ’-ছ’টা ডিম সিদ্ধ আর এক খাবলা নুন এসে হাজির!”

“অবাক হয়ে বললাম, ‘এতো ডিম কী হবে?’

“যে ছেলেটি এনেছিল—মুখটি ভারি মিষ্টি—খুবই সরল ভাবে বলল, ‘আমরা তো ছ’টা করেই খাই, তার কমে ডিম খাওয়া যায় নাকি?’

“আলাপ হতে জানলাম ওর নাম জটিল মাহাতো। ছেলেটির ভাবভঙ্গি দেখে আমি বেশ অবাক হলাম। ওর মুখ-চোখের মধ্যে এমন মিষ্টি একটা সরলতা মাখানো যে ওকে পছন্দ না করে উপায় নেই। অথচ ওর এমন নাম কেন, বলতে পারব না। বেচারা সত্যিই বড় সরল। কিন্তু সেই সরলতার দাম যে আমাকে এভাবে দিতে হবে সেটা স্বপ্নেও ভাবিনি।”



“জলখাবারের পর্ব চুকিয়ে কাজে বসলাম। দেখা গেল বেশিরভাগ হিসেবই অসম্পূর্ণ। একটু ধমক ধামক দিয়ে নির্দেশ দিলাম সবাই মিলে বসে হিসেব-নিকেশ শেষ করুন। সন্ধের আগে সমস্ত পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিতে হবে।”

“কথাবার্তায় বুঝলাম মানুষগুলো ভীষণ সাদাসিধে। তবে হিসেব-নিকেশের ব্যাপারে সত্যিই কাঁচা। যাই হোক কাজ চলতে লাগল। দরকার মতো বুঝিয়ে দিতে লাগলাম। ওরাও চটপট কাজ এগিয়ে নিয়ে চলল। খানিক ওদের কাজকর্ম দেখে আমি অফিস ঘরে ল্যাপটপ খুলে রিপোর্ট বানাতে লাগলাম।”

“দুপুর দেড়টা নাগাদ পেটেয় ছুঁচো ডন মারতে লাগল। জটিলকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওহে দুপুরে খাবারের কী বন্দোবস্ত আছে? এখানে হোটেল-টোটেল কিছু আছে কি?’

“জটিল মাথা চুলকিয়ে বলল, ‘বাবু, আমি চাল, মাংস, মশলা সবই কিনে এনেছিলাম সকালে, কিন্তু রান্না করবে কে? সবাইকে তো আপনি হিসেবের কাজে লাগিয়ে দিলেন!’

“তার মানে?’ আকাশ থেকে পড়ি!

“একজন কর্তাগোছের ব্যক্তি এগিয়ে এসে জানালেন, যেহেতু আমি সবাই মিলে কাজটা করতে বলেছি তাই শুধু করনিকরাই নয়, কো-অপারেটিভের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত কর্মচারী—এমনকি পিওন, ঝাডুদার, সাফাইকর্মী—মায় এই জটিল মাহাতো, যে কিনা আসলে চা-টা করা ফাইফরমাসখাটা লোক—সে পর্যন্ত লেগে পডেছে কো-অপারেটিভের হিসেব-নিকেশ করার কাজে! এখন রান্না করে কে? এটা এমনই অজ পাড়াগ্রাম যে হোটেল এখানে বাহুল্য মাত্র!”

“রাগব না হাসব সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। একবার ভাবলাম ওরা হয়তো আমাকে টাইট দেবার জন্য এটা করেছে, কিন্তু মানুষগুলোর বিহ্বল চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, না ওরা সত্যিই বড় সরল। অডিটর নাম শুনেই ভয় পেয়ে গেছে। তার ওপর আমার বিপুল স্বাস্থ্যবান চেহারাটা দেখে যমের মত ভয় পাচ্ছে।”

“জটিলকে বললাম, ‘তুমি গিয়ে রান্নার কাজে হাত লাগাও।’

“সাড়ে চারটে নাগাদ যখন কলাপাতায় গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত আর খুরিতে উঁচু করে সাজানো দিশি মুরগির ঝোল পেলাম। লোভে আমার জিভে আক্ষরিক অর্থেই জল গড়াতে লাগল। ভাতের স্তুপের মাঝখানে একটা বড়সড় গর্ত করে খুরিটা উপুড় করে দিলাম। লাল ঝোলে মাখিয়ে মাংসের একটা টুকরোসুদ্ধ ভাতের গ্রাস মুখে পুরতেই কিছুক্ষণ কোন কথা বলতে পারলাম না! প্রচন্ড খিদে থাকায় চটপট কিছু বোঝার আগেই চালান করে দিয়েছিলাম পেটে। মনে হল তরল আগুন নামছে গলা দিয়ে! পাতার দিকে চেয়ে দেখি লাল রং’টা আধবাটা শুকনো লংকার। তেড়ে ঝাল দিয়েছে।”

“হু-হা করতে করতে জলের বোতল ঢেলে দিলাম গলায়। সামনেই হাত জড়ো করে দাঁড়িয়ে ছিল জটিল। আমি মিষ্টি করে বললাম, “বাবা জটিল, কী করে এমন সুন্দর রান্না করেছ?’

“জটিল আমার প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গটা মোটেও ধরতে পারল না। লাজুক স্বরে বলল, ‘পেঁয়াজ, রসুন আর লঙ্কা দিয়ে করেছি। সবাই বলে আমার রান্না খুব ভাল। তা আপনার ভাল লেগেছে? আর একটু দিই?’

“বুঝলাম বেচারা বড়ই সরল। বকাবকি না করে বললাম, ‘খানিকটা শুকনো ভাত দাও দিকি।’

“কোনমতে শুকনো ভাতে ঝোল ছাড়া মাংস দিয়ে আহার শেষ করলাম।”

“মধ্যাহ্নভোজন বলব না, অপরাহ্নভোজন শেষে ওকে ডেকে বললাম, ‘শোন বাপু, তুমি খুব ভাল রান্না করেছ। আজ চলে যাব, কাল তো আবার এখানে আসতে হবে, কাল দুপুরে একটু অন্যরকম হোক, তুমি কাঁচা লঙ্কা দিয়ে রান্না কোর কেমন?’

“জটিল বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নেড়ে চলে গেল।”

“পরদিন আর সবাই যাতে হিসেবের কাজে লেগে না পড়ে সেটা আগে ভাগে নিশ্চিত হয়ে নিলাম। আজ আর দেরি হল না। দুপুর একটা নাগাদ জটিল খেতে ডাকল। হাত ধুয়ে চনমনে খিদে নিয়ে এগিয়ে গেলাম টেবিলের দিকে। আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের কথা শুনেছিলাম, ছবিও দেখেছি, কিন্তু সাক্ষাৎ হয়নি। এক গ্রাস মুখে তুলতেই টের পেলাম সেটা কী জিনিস!”

“ঝাল যে কী মারাত্মক হতে পারে সেটা ওই মাংস যে না খেয়েছে সে জীবনেও টের পাবে না!”

“মুখের ভাত টেবিলে ফেলে দিয়ে চিৎকার করে উঠলাম, ‘জ-অ-অ-টি-ল!!!’

“দৌডে এল জটিল, ‘কী হয়িছে স্যার?’ শিশুর মতো অপার বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করল।

“এটা কী রান্না করেছ?” আমি গর্জে উঠি রাগে, ‘কাল যে বললাম কাঁচা লঙ্কা দিয়ে রান্না করতে?’

“কাঁদো-কাঁদো সুরে জটিল বলল, ‘বিশ্বাস করুন স্যার আমি কাঁচা লঙ্কাও দিয়েছি!’

“আমি চমকে উঠে বললাম, ‘কাঁচা লঙ্কাও মানে?’

‘ওই রোজ যেমন রান্না করি তেমনি পেঁয়াজ, রসুন, গোটা লঙ্কা বেটে করেছি, তার ওপরে পনেরো কুড়িটা কাঁচা লঙ্কা রগড়ে দিয়েছি। এতোগুলো লোক খাবে এ ক’টা তো লাগবেই—তাই না স্যার?’

“কী যে বলি বুঝে উঠতে পারলাম না। বেচারা বড়ই সরল!”

“ওই শেষ, তারপর থেকে লঙ্কা দেখলেই যে কী আতঙ্ক হয়ে যায় কী বলব তোমাদের!” পিসে দুঃখ দুঃখ মুখ করে বললেন, “জন্মের মত লঙ্কা খাবার সাধ মিটে গেছে আমার।”

– বাবিন

মতামত