পুজো স্পেশাল

জিয়ন-কাঠি

        মোবাইলটার দিকে চেয়ে তাহিতির চোখে জল চলে এল। নেটওয়ার্কের বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই তাতে। ব্যাটারিও শেষ দাগ ছুঁইছুঁই। দাদুন বলল, একটা ট্রাক্টর নাকি উল্টে পড়ে গেছে ইলেকট্রিক পোস্টের ওপর, তাই কখন ফিরবে বলা মুশকিল!

কাঁদো-কাঁদো মুখে তাহিতি বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “এখন আমি ক্যান্ডিক্র্যাশ খেলব কী করে?” বাবা অসহায় মুখে মায়ের দিকে তাকালেন। মা তোম্বা হয়ে জানলার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, “তখনই বলেছিলাম, এইসব অজ পাড়াগাঁয়ে আসার দরকার নেই!”

আসলে তাহিতিরা থাকে কানাডায়। এবার ডিসেম্বর মাসে ওরা কলকাতা এসেছিল। কলকাতায় তাহিতি’র মামারবাড়িতে বেশ কয়েকদিন থাকার পর বাবা হঠাৎ করে প্ল্যান করে ফেললেন ওঁর দেশের বাড়িতে ঘুরতে যাবেন। তাহিতি’র ঠাকুরদা বা ঠাকুমা কেউ বেঁচে নেই। বাবার কাকা-জেঠুরা কেউ কেউ আছেন এখনও। বাবা বলেছেন, সেই পুরনোদিনের বাড়িটা কেমন ছিল সেটা নাকি তাহিতির দেখা খুব দরকার। তাই আজ বিকালে ওরা এসে পৌঁছেছে কিশোরগঞ্জে। কিশোরগঞ্জ যাবার জন্যে হাওড়া থেকে ট্রেনে করে প্রথমে বেশ কিছুদূর গিয়ে একটা রেলস্টেশনে নামতে হল। তারপর ফের রিকশায় চড়ে কাঁচা-পাকা রাস্তা ধরে প্রায় আধঘন্টা যাবার পর পৌঁছেছে ওরা।

বাবার দেশের বাড়িটা বিশাল বড়। মাটির তৈরী দোতলা। মোরাম বিছানো পথ পেরিয়ে ঢুকতে হয় বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে। বিশাল উঠোন। সেটাকে ঘিরে গোটা বাড়িটা। উঠোনে শুকোতে দেওয়া হয়েছে ধান। খড়ের দড়ি দিয়ে পাকিয়ে-পাকিয়ে বিশাল বড় গোটা দুয়েক ঘরের মত কী যেন বানানো। বাবা বললেন, ওগুলোকে নাকি মরাই বলা হয়। ওর মধ্যে সারাবছরের খাবার জন্যে ধান রাখা থাকে। তার থেকে চাল হয়। তাহিতি এতদিন রাইস খেয়েছে কিন্তু স্কুলের বইয়ের ছবির বাইরে কোনদিন ধান দেখেনি, এই প্রথম দেখল।

ওরা বাড়িতে পা রাখতেই কোত্থেকে দুদ্দাড় করে একগাদা মানুষ হইহই করে ছুটে এলেন! সবাই মিলে ঘিরে ধরলেন ওদের। “বাবা, কত্তদিন পর এলি রে নালু! বৌমা কী সুন্দর হয়েছে রে। এটি বুঝি তোর মেয়ে? বাহ ভারি মিষ্টি তো!” সবাই তাহিতিকে গাল টিপে আদর করতে লাগল। তাহিতির ভারি অস্বস্তি হতে লাগল। ওদের কাউকে ও চেনে না। ও এই প্রথম এল বাবার গ্রামের বাড়িতে। সকলেই অচেনা। তবে বাবার যে ‘নালু’ বলে একটা নাম আছে এটা ও কখনও জানত না। ও মুচকি মুচকি হাসতে লাগল বাবার দিকে চেয়ে। বাবাও মনে হল বেশ লজ্জায় পড়ে গেছেন এই ‘নালু’ ডাক শুনে।

ভিড় ঠেলে একজন মানুষ এগিয়ে এলেন তাহিতির দিকে। দেখে বেশ বুড়ো বলে মনে হচ্ছিল। মাথায় অল্প চুল, সমস্তটাই পেকে সাদা হয়ে গেছে। উনি তাহিতিকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “এই তো আমার টুকুন সোনা এসে গেছে। কেমন আছ মা?”

তাহিতির খুব রাগ হতে লাগল। ও বলল, “আমার নাম টুকুন নয়, আমার নাম তাহিতি।”

মা’ও ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছিলেন, উনি বললেন, “কাকামণি, ওকে তাহিতি বলেই ডাকবেন। অন্য নামে ডাকা ও পছন্দ করে না।”

তাহিতি বুঝল, ইনি বাবার আঙ্কেল হন। তার মানে তাহিতি’র গ্র্যান্ড-পা। উনি একটু যেন মনমরা হয়ে গেলেন। সামান্য হেসে বললেন, “তা বেশ তো, তবে তোমার ভালোনামটা খুব বড় আর খটমট শোনায়, আমার মত গেঁয়ো লোকের জন্য কোনো সহজ ডাকনাম নেই?”

কারো মনখারাপ হলে তাহিতি চটপট বুঝে যায়। বাবার এই কাকামণির যে মায়ের কথাটা খারাপ লেগেছে সেটা ও বুঝতে পারল। ও তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “গ্র্যান্ড-পা, তুমি আমাকে কিট্টি বলে ডাকতে পারো।”

এইবার ওঁর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। উনি হেসে বললেন, “বাহ এটা খুব ছোট্ট আর সুন্দর—তা কাঠি তুমি কোন ক্লাসে পড়?”

“উফ, আমি বললাম কিট্টি, তুমি কীসব উল্টোপাল্টা নাম বলছ...” তাহিতি ভারি রাগ করে।

“ওহো, বুড়োমানুষ তো তাই ভুল হয়ে গেছে। তুমি কিছু মনে কোর না কিট্টু। তুমি আমাকে দাদুন বলবে, কেমন?”

তাহিতি এবার খুশি হয়। ও বলে, “ইটস্ ওকে দাদুন।”

“তুমি কোন ক্লাসে পড়?”

“আমি তো থার্ড স্ট্যান্ডার্ডে পড়ছি।”

দাদুন বললেন, “ঠিক আছে, কাল তোমাকে একটা সুন্দর জায়গায় নিয়ে যাব। দেখবে খুব ভালো লাগবে।”

এরপর বাবা বাড়ির সবার সঙ্গে তাহিতি আর ওর মায়ের পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলেন, “এটা তোমার পিসি হয় প্রণাম কর। ইনি মিষ্টি দাদু, খুব বড় মিঠাইয়ের দোকান আছে এঁর। এটা পালক—তোমার দিদি হয়—বটুকাকার মেয়ে। আর এ হল পিকলু। তোমার দাদা।” এমনি করে কত লোকের সঙ্গে যে আলাপ হল তার ইয়ত্তা নেই! তাহিতি সকলের নাম মোটেই মনে রাখতে পারল না। সবাই হাসি হাসি মুখে ওদের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন। যেন কতদিনের আলাপ। যদিও তাহিতি কাউকেই চেনে না। সবাইকেই এই প্রথম দেখল ও।

 

এ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল, কিন্তু মুশকিলটা হল সন্ধে হতেই। এ গ্রামে ইলেকট্রিসিটি আছে, মোবাইল টাওয়ারও ছিল। কিন্তু সন্ধের মুখে কে জানে কেন সব গায়েব হয়ে গেল। ওদের থাকার জন্য দোতলার একটা ঘর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। লম্বা টানা বারান্দার শেষ ঘরটা। পালকদিদি একটা হ্যারিকেন জ্বালিয়ে দিয়ে গেল। এমন বাতি তাহিতি আগে কোনদিন দেখেনি। বাবার মুখেই এর নাম শুনল ও। সেই হ্যারিকেনের টিমটিমে আলোয় মায়ের নজরে পড়ল ওঁর আইফোনের চার্জ শেষ হবার পথে! তাছাড়া নেটওয়ার্কও বিন্দুমাত্র নেই!

বাবা বললেন, এমনিতেই এখানকার নেটওয়ার্ক ভীষণ দুর্বল, তারওপর লোডশেডিং হলে অনেক সময়ই টাওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ কেটে যায়। ব্যাস কথাটা শুনে মা তো রেগেই আগুন, “এ কেমন জায়গায় নিয়ে এলে? কারেন্ট নেই, নেটওয়ার্ক নেই, মানুষ বাস করে এখানে!”

তাহিতিও বিরক্ত হয়ে গেল। ও মাঝে মাঝে মায়ের মোবাইলটা নিয়ে গেম খেলে, এবার তো সেটাও হবে না! এখন টাইম পাস করে কী করে? এখানে তো ওর বন্ধুও তেমন কেউ নেই। সকলেই ওর চেয়ে বয়সে ঢের বড়। বাবা মাথা নিচু করে মায়ের বকুনি খেতে লাগলেন। তাহিতির অবশ্য সেটাও ভালো লাগল না। বাবাকে ও খুব ভালবাসে। মায়ের চেয়েও বেশি। ও পায়ে পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল বারান্দায়।

বারান্দায় একটা ছেলে দাঁড়িয়েছিল। তাহিতির চেয়ে কিছুটা বড় হবে। হাতে একটা পাখি। পাখিটা কিন্তু ছটফট করছে না। শান্ত হয়ে বসে আছে ওর হাতে। তাহিতি অবাক জিজ্ঞেস করল, “এটা কি তোমার পোষা পাখি?”

ছেলেটা হেসে বলল, “না, বাসা থেকে পড়ে গেছে। ও তো খুব ছোট, উড়তে পারে না, তাই বাসায় ফিরতে পারছে না।”

তাহিতি কাছে গিয়ে দেখল ছোট্ট একটা পাখি, ও নাম জানে না। ছেলেটা বোধহয় ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলল, “এটা কোকিলের ছানা।”

“কোকিল?” তাহিতি এই নামটা প্রথম শুনল।

“দাদুভাই, কোকিল হল যাকে বলে ‘কাক্কু’।”

দাদুন কখন যে এখানে চলে এসেছেন ও বুঝতে পারেনি।

ও বলল, “তাই নাকি? কাক্কু এমন বিচ্ছিরি দেখতে হয়?”

“কাক্কুকে তো কাক মানে ক্রো পর্যন্ত চিনতে পারে না। নিজের ছানা মনে করে ওকে মানুষ করে। তারপর যখন বড় হয়ে যায়, আওয়াজ শুনে চিনতে পেরে তাড়িয়ে দেয়।”

“আচ্ছা দাদুন, কাক্কুর বাবা-মা নিজের ছানাদের অন্যের ঘরে ছেড়ে যায়, ওদের কষ্ট হয় না?”

দাদুন হেসে বলেন, “এটাই প্রকৃতির নিয়ম। কোকিল নিজের বাসা বাঁধে না।”

ওই ছেলেটার দিয়ে তাকিয়ে দাদুন বলেন, “ওকে চেন? এটা তোমার দাদা হয় কাঠি। তোমার জেঠুর ছেলে, জেঠতুতো দাদা। ওর নাম জিয়ন।”

তাহিতির প্রচন্ড রাগ হয়ে যায়। দাদুনের মুখে ফের ‘কাঠি’ নামটা শুনে ও দুমদাম করে পা ফেলে ঘরে চলে যায় মায়ের কাছে। উনি নিশ্চয়ই জেনেবুঝেই দুষ্টুমি করছেন, কারণ পিছন থেকে দাদুনের হো-হো করে হাসির শব্দ ওর কানে আসে।

 

পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল তাহিতির। এমনিতে ও প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই মায়ের মোবাইলটা নিয়ে একটু গেম খেলে। আজ তো চার্জ নেই, তাই খেলা যাবে না। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। তাকিয়ে দেখল বাবা-মা অঘোর ঘুমে তলিয়ে আছেন। কী করা যায়, ও আবার কম্বল জড়িয়ে আর একটু ঘুমিয়ে নেবে ভাবল, কিন্তু হঠাৎ কানে এল, বাইরে থেকে অদ্ভুত একটা কিচ্ কিচ্ শব্দ ভেসে আসছে। এমন শব্দ তাহিতি আগে কখনও শোনেনি। তড়িঘড়ি বিছানা থেকে উঠে ও পা টিপে-টিপে দরজা খুলে বাইরে বেরুল। ওমা! বাইরেটা কী সুন্দর লাগছে! সবে আলো ফুটেছে। আকাশটা এখনও পুরোপুরি অন্ধকার তাড়িয়ে উঠতে পারেনি। কাল রাতের বৃষ্টিভেজা মাটি থেকে মিষ্টি একটা গন্ধ বেরিয়ে আসছে, আর তার সঙ্গে মিশে গেছে নানা রকম ফুলের-ফলের গন্ধ। আকাশে উড়ে যাচ্ছে ঝাঁকে-ঝাঁকে পাখি। নানারকম পাখি। লাল-নীল-ধূসর-সাদা কত্তো রঙের পাখি। তাদেরই আওয়াজে আকাশ-বাতাস মুখর হয়ে গেছে। তাহিতির মনটা আনন্দে নেচে উঠল। একটা পাখিকে কি ছুঁয়ে দেখা যাবে না? আদর করা যাবে না? আচ্ছা ওদের কি পোষা যায়? পোষ মানবে কি? এসব হাজারো প্রশ্নে মনটা বিহ্বল হয়ে গেল।

হঠাৎ নিচে থেকে ওর নাম ধরে একটা ডাক শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখে—জিওনদাদা। ওর দিকে চেয়ে হাসছে। তাহিতিও হাসল। জিওনদাদা জিজ্ঞেস করল, “যাবে?”

“কোথায়?”

“আগে বলব না, যাবে তো চল, খুব মজা হবে।”

তাহিতি খুশি হয়ে দৌড়ে মাটির দোতলা বাড়ির এবড়োখেবড়ো সিঁড়ি বেয়ে টাল সামলাতে সামলাতে নেমে এল। বাড়ির প্রায় সব্বাই এর মধ্যেই উঠে গেছেন। কেউ গোয়ালে গরুকে খাবার দিচ্ছেন, কেউ বিচালি কাটছেন, কেউ আবার বেশ শব্দ করা একটা স্টোভ জ্বালিয়ে চা বসিয়েছেন। ওদের কেউ খেয়াল করল না। জিওনদাদা ওর হাত ধরে টান দিল বাইরের দিকে, “তাড়াতাড়ি চল, সবাই দেখে ফেললে আমাদের যেতে দেবে না...”

 

বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটুখানি যেতেই একটা অদ্ভুত জায়গায় চলে এল ওরা। সামনে যতদূর নজরে পড়ছে দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি। বিশাল একটা নদীর মত, অথচ এটা নদী হতেই পারে না। একটা লেক বলা চলে। তাহিতি জিজ্ঞেস করল, “এটা কী গো জিওনদাদা? রিভার নাকি লেক?”

জিওনদাদা বলল, “এটা আগে নদীই ছিল, কিন্তু পড়ে এইদিক থেকে সরে গেছে। তবে তারই একটা অংশ এখন বিলের মত রয়ে গেছে। এটাকে বলে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ।”

“কী বললে? কিসের কৃতি?” তাহিতি শব্দটা উচ্চারণ করতে পারে না ঠিক করে।

“উউ...” জিওনদাদা একটু ভেবে বলল, “ইংরেজিতে এটাকে বোধহয় হর্স-শু লেক বলে।”

“ও মাই গড!” তাহিতি মাথায় হাত দেয়, “আমি এটার কথা জিওগ্রাফি বইতে পড়েছি। কিন্তু কোনদিন যে সত্যিই দেখতে পাব সেটা ভাবতেই পারিনি।”

জিওনদাদা খুশি হয়ে বলে, “এর জল কিন্তু খুব একটা গভীর নয়। চল তোমাকে সেই মজাটা দেখাব।” জিওনদাদা জলের কাছাকাছি ঝুঁকে পড়া একটা গাছের দিকে তাহিতিকে নিয়ে এগিয়ে গেল। এখানে একটা ছোট নৌকা বাঁধা ছিল গাছের সঙ্গে।

তাহিতির অবাক হবার এখনও অনেক বাকি ছিল। ও চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করতে থাকে, “এটা কার বোট জিওনদাদা? আমরা কি এটায় চাপব? তুমি বোট চালাতে পারো?”

জিওনদাদা উত্তর না দিয়ে হাত ধরে ওকে নৌকোয় ওঠায়। তারপর বৈঠায় চাপ দিয়ে বলে, “কাল রাতে তুমি কোকিল দেখেছিলে, কেমন লাগল?”

“উফ, দারুণ, দারুণ!” তাহিতি খুশিতে লাফিয়ে ওঠে।

“তাহলে আজ তোমাকে আরও দারুণ সব জিনিস দেখাব।”

“কী দেখাবে জিওনদাদা?”

“উঁহু, এখন তো বলব না।” জিওনদাদা চোখ গোলগোল করে বলে, “এখন তুমি একদম চুপটি করে বসে থাকো, বেশি কথা বললেই সেই মজাটা আর হবে না।”

তাহিতি সঙ্গে সঙ্গে মুখে আঙ্গুল দিয়ে বসে পড়ে নৌকার কাঠের পাটাতনে। জিওনদাদা খুব সাবধানে, যতটা সম্ভব শব্দ না তুলে বৈঠা দিয়ে জল ঠেলতে লাগল।

 

দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল জলের মাঝে মাঝে একরকম জলজ গাছপালা ভেসে বেড়াচ্ছে। জিওনদাদা বলল, ওগুলোকে নাকি কচুরিপানা বলে। কাছে আসতেই দেখা গেল শুধু তাই নয়, ওই কচুরিপানার ওপর অগুনতি পাখি বসে রয়েছে। রংবেরঙের নানান রকম পাখি। আর তাদের মুখে অবিরাম কিচকিচ শব্দ। যেন অনেকগুলো মানুষ বসে মনের আনন্দ খোশগল্প করছে। একটা আবার নীল রঙা পাখি জলের মধ্যে পুঁতে রাখা একটা লাঠির ওপর স্থির হয়ে বসে যেন প্রেয়ার করছে। ওটা নাকি ‘কিংফিশার’। জিওনদাদা ওর বাংলা নাম বলল, ‘মাছরাঙ্গা’। খুশিতে তাহিতি যেন পাগল হয়ে যাবে। এত সুন্দর-সুন্দর সব পাখি যে এই পৃথিবীতে আছে সেটাই ওর জানা ছিল না।

জিওনদাদা আরও একটু দূরে লেকটার মাঝখানে একটা আইল্যান্ড মত জায়গায় নিয়ে গেল। আইল্যান্ডের বাংলা যে দ্বীপ সেটা জিওনদাদা না থাকলে তাহিতির অজানায় থেকে যেত। এইখানে প্রচুর সাদা বড় বড় ঠোঁঠের পাখি দেখা গেল। তাহিতি এর ছবি দেখেছিল ওর সায়ান্স বই’তে। একে বলে ‘ক্রেন’ আর বাংলায় ‘সারস’।

জিওনদাদা মুখ দিয়ে অদ্ভুত একটা শব্দ করে আওয়াজ করতেই পাখিগুলো ওদের দিকে ঘুরে তাকাল। জিওনদাদা নৌকার পাতার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে বেশ কয়েকটা মাছ বের করে নাড়াতে লাগল। অমনি পাখিগুলো এগিয়ে এল ওদের দিকে। তাহিতি অত বড় পাখিগুলোকে আসতে দেখে রীতিমত ভয় পেয়ে জিওনদাদার হাতটা চেপে ধরল। জিওনদাদা হেসে বলল, “কোনো ভয় নেই রে কিট্টি। ওরা কিচ্ছু বলবে না। ওরা তো আমাকে চেনে। আমি রোজ এসে ওদের মাছ খাইয়ে যাই।”

তাহিতি ভয়ে ভয়ে বলল, “তুমি মাছ পাও কোথা থেকে? এই যে বোটের মধ্যে মাছ রয়েছে, এগুলো কাদের?”

“এই নৌকোটা সুলতানের। সুলতান ভোররাত্রে মাছ ধরে এনে সেই মাছ বড়বাজারে বিক্রি করে। আর আমার জন্য ছোট মাছগুলো রেখে যায় নৌকোর ভেতরে। আমি সেগুলো পাখিদের খাইয়ে আসি।”

সত্যিই সারসগুলো জিয়নদাদার দেওয়া মাছগুলো তুলে নিয়ে গেল। ভয়ও পেল না, আবার ওদের কোনো ক্ষতিও করল না।

তাহিতি মনে মনে ভাবতে লাগল, ভাগ্যিস মোবাইলটার চার্জ ফুরিয়ে গেছিল, নইলে এসময় তো সে গেম খেলায় ব্যস্ত থাকে। হয়ত জিওনদাদার সঙ্গে আসতেই ইচ্ছে করছিল না। আর তাহলে এমন দারুন একটা মজা মিস হয়ে যেত।

জিওনদাদা বলল, “সাইবেরিয়ায় এই সময় প্রচন্ড ঠান্ডা পড়ে বলে এইসব পাখি ওখান থেকে উড়ে চলে আসে এই এলাকায়। শীতের শেষে আবার ওরা ফিরে যায়...” এই পর্যন্ত বলে জিওনদাদা চুপ করে গিয়ে দূরের আর একটা দ্বীপের দিকে তাকাল। তারপর কথাটা শেষ করল, “...আমাদের ফেলে রেখে।”

তাহিতির মনটা কেন জানি খারাপ বলে গেল। ও মনে মনে বলল, “আমরাও তো এখানে এসেছি দু’দিনের জন্য। তারপর আমরাও ফিরে যাব কানাডায়।”

 

এদিকে বাড়িতে হুলুস্থুলু কাণ্ড বেঁধে গেছে। সবাই খোঁজ খোঁজ করছে ওদের দু’জনকে। ওরা তো কাউকে বলে আসেনি। এদিকে প্রায় দু’ঘন্টা হয়ে গেছে। মা খুব রাগারাগি করছেন বাবার ওপর, “তোমাকে কে বলেছিল এইসব গ্রামে-গঞ্জে আসতে? কোথায় সাপে-টাপে কাটবে কী জলে ডুবে...আক্কেল হল না তোমার!”

এইসময়ই তাহিতিরা ফিরে আসতে মায়ের সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল ওদের দু’জনের ওপর। ভীষণ বকাবকি করতে লাগলেন। বাবা এগিয়ে এসে ওকে বাঁচিয়ে দিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় গিয়েছিলি কিট্টি?”

সব শুনে বাবা তো আনন্দ লাফিয়ে উঠলেন, “আরে আমি তো তোদের নিয়ে সাত পালোয়ানের বিলে যেতামই, তুই আগেভাগেই ঘুরে নিলি? তাহলে তো খুব ভালই হয়েছে। এবার আমাদের গাইড করতে পারবি।”

তাহিতি অবাক হয়ে বলল, “ওই লেকটার নাম সাত পালোয়ানের বিল? কেন কেন? এমন নাম কেন?”

দাদুন এগিয়ে এসে বললেন, “ওমা, আমি তো কাল বললুম নিয়ে যাব, তা জিওন তুই তার আগেই ওকে ঘুরিয়ে নিয়ে এলি! আচ্ছা বেশ বেশ, এসো কাঠি, গরম কচুরি খেতে খেতে শুনবে গল্পটা। আমি বলব তোমায়। উফ মায়ের বকুনি খেয়ে তো মুখটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে...”

তাহিতির আর কাঠি নামটা মোটেও খারাপ লাগল না দাদুনের মুখে। কারণ নৌকা করে ফেরার পথে জিওনদাদার মুখে ঠাকুমার ঝুলি আর জিওনকাঠির গল্প শুনেছে। আর গল্পটাকে খুব ভালোও বেসে ফেলেছে।

ও বলল, “আচ্ছা দাদুন, আমি তো কচুরিপানা দেখে এলাম জলের মধ্যে। কচুরি কি সেই কচুরিপানা দিয়েই বানায়?”

সবাই হোহো করে হেসে উঠল ওর কথা শুনে।

 

কানাডায় ওদের বাড়ির পিছন দিকে একটা পার্ক আছে সেখানেও অনেক পাখি আসে তাহিতি মনে মনে ঠিক করল এবার কানাডায় ফিরে গিয়ে রোজ সকালে ওই পাখিদের নিজের ব্রেক-ফাস্টের থেকে একটু করে খাবার খাইয়ে আসবে আর এখান থেকে একটা ঠাকুমার ঝুলি আর জিওনকাঠির গল্পের বই কিনে নিয়ে যাবে তারপর বাবার কাছ থেকে বাংলা পড়তে শিখে নিজেই বইটা পড়বে


অলঙ্করণ: নচিকেতা মাহাত


– বাবিন

মতামত